ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প১৮ নভেম্বর, অনলাইন ডেস্কঃ দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। ব্যক্তি পর্যায়ের এ শিল্প সারা দেশেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশীয় প্রযুক্তির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বদলে গেছে দৃশ্যপট। বাংলাদেশে প্রস্তুত মেশিনারিজ এখন চীন-ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিশ্ববাজারে ঠাঁই করে নিচ্ছে। কদিন আগেও অতিপ্রয়োজনীয় যেসব যন্ত্রপাতি-মেশিনারিজ শতভাগ আমদানিনির্ভর ছিল, আজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে সেসব রপ্তানি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকার ধোলাইখালের মোটর পার্টস ও মেশিনারিজ শিল্প, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বহুমুখী শিল্পাঞ্চল ছাড়াও অনেক স্থানেই মনোযোগের আড়ালে গড়ে উঠছে একেকটি যুগান্তকারী শিল্প কারখানা।

শুধু রাজধানীর আশপাশের এলাকায় নয়, ঢাকার বাইরে বগুড়া, রংপুর, জয়পুরহাট, যশোর, পাবনায় গড়ে উঠছে ক্ষুদ্র মেশিনারিজ শিল্পের পল্লীও। ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিজ প্রচেষ্টায় অভাবনীয় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য মহলের সহায়তা আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হালকা ও মাঝারি শিল্পের সফলতায় নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির সভাপতি ও এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক মির্জা নুরুল গনি শোভন জানান, ‘দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমাদের দেশেই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সবচেয়ে ভালো পলিসি নেওয়া হয়েছে। এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন ও তদারকি প্রয়োজন। ভালো দিক হচ্ছে, নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। দেশে প্রায় ৪ কোটি বেকারের জন্য এসএমই খাতই ভূমিকা পালন করছে। সরকার ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত পদক্ষেপ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।’

জানা যায়, ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পে ব্যতিক্রমী উদ্ভাবনের মাধ্যমে কয়েক যুগ ধরেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে জিনজিরা। এখানকার ঝুপড়ি বস্তির অজস্র কারখানায় খুদে ইঞ্জিনিয়ারদের তৈরি হাজারো পণ্যসামগ্রীর কদর রয়েছে সর্বত্র। দেশ-বিদেশে ‘মেড ইন জিনজিরা’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতিও আছে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা জিনজিরা-শুভাঢ্যা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়েই এ শিল্পের অভাবনীয় বিস্তার। গোটা এলাকায় চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। গড়ে উঠেছে দুই হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্প কারখানা। ১২ লাখ কারিগর-শ্রমিকের উদয়াস্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠছে সম্ভাবনার আরেক বাংলাদেশ। সুই, ব্লেড, আলপিন, নাটবল্টু, রেল-বিমানের যন্ত্রাংশ, ফ্লাস্ক, মোবাইল ফোন সেট থেকে শুরু করে সমুদ্রগামী জাহাজ পর্যন্ত তৈরি হচ্ছে এখানে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মালামাল তৈরি করছেন লেখাপড়া না জানা ‘ইঞ্জিনিয়াররা’।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর গবেষণা শেষে জাপান, কোরিয়া, চীন যেসব সামগ্রী উৎপাদন ও বাজারজাত করে, সেসব জিনিস এক নজর পরখ করেই হুবহু তৈরি হতে থাকে জিনজিরায়। সেখানকার অভাবনীয় মেধার খুদে কারিগরদের দক্ষতা বিশ্বকে অবাক করে দিচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানান, সরকারি অনুমোদন ও পুঁজি সহায়তা পেলে জিনজিরার কারিগররা অত্যাধুনিক ড্রোন-রোবটও তৈরি করে দিতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে জিনজিরাকেন্দ্রিক খুদে কারখানাগুলো থেকে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদিত অনেক পণ্যই দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। জিনজিরাকে অনুসরণ করে দেশজুড়ে এ রকম ৪০ হাজারেরও বেশি শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতি (বাইশিমাস) সূত্র জানায়, ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের হালকা প্রকৌশল শিল্পে বছরে টার্নওভার ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও হচ্ছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ৬ লাখ কর্মীসহ পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ৬০ লাখ লোকের জীবন-জীবিকা। এ প্রসঙ্গে এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘সারা দেশে নতুন উদ্যোক্তাদের কর্মকাণ্ড বিশাল ভূমিকা রাখছে আমাদের অর্থনীতিতে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুবিধা ছাড়াই উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসেছেন।’ তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমাদের চামড়াশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, আগর-আতর, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, সেবা খাত, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শিক্ষা প্রশিক্ষণ, ওষুধশিল্পের বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের দেশ থেকে আগর-আতর রপ্তানি হয় কেজিপ্রতি ৪-৫ হাজার ডলারে। সেই পণ্য দিয়ে স্প্রে তৈরি করে বিক্রি করা হয় ৬০ হাজার ডলারে। এগুলো দেশে করা গেলে আমাদের বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।’

বগুড়ায় নীরব বিপ্লব :  উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ঘটে গেছে নীরব বিপ্লব। বিসিক শিল্পনগরীসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির ৭ শতাধিক কল কারখানা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এসব কল কারখানা প্রতি বছর দেড় হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করছে। স্থানীয় কৃষকের চাহিদা মেটানো এসব কৃষি যন্ত্রপাতি প্রতিবেশী ভারতসহ অন্যান্য দেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এসব কারখানায় তৈরি যন্ত্রাংশের মধ্যে রয়েছে পানির পাম্প, টিউবওয়েল, শ্যালো ইঞ্জিনের লাইনার, পিস্টন, পাওয়ার টিলার, ধান ও ভুট্টা মাড়াই মেশিনসহ কৃষি উপকরণ। এ ছাড়া প্লানার, ক্রাংক শ্যাফট্ গ্রানডিং, মিলিং, সেপার, বোরিং মেশিন, লেদ মেশিন, স-মেশিন ইত্যাদি তৈরি হয়। বগুড়ার বিসিক, গোহাইল রোড, স্টেশন রোড, রেলওয়ে মার্কেট, সান্তাহারসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার উৎপাদিত যন্ত্রাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে হলে দরকার পাম্প টেস্টিং সেন্টার, হিট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, মডেল ওয়ার্কশপ নির্মাণ। কিন্তু সেদিকে কারও যেন ভ্রুক্ষেপ নেই। এ শিল্পে সরাসরি প্রায় ১ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

রংপুরে দেড় লাখ মানুষ স্বাবলম্বী : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে রংপুরে প্রায় দেড় লাখ মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন। তবে জায়গার অভাবে রংপুরে দ্বিতীয় শিল্পনগরী গড়ে উঠছে না। মাত্র ২০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা শিল্পনগরীতে ২৭টি ক্ষুদ্র কারখানা স্থাপিত হয়েছে। বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে শতাধিক কুটিরশিল্প। এসব শিল্পে জড়িত দেড় লাখ মানুষ স্বাবলম্বী হয়েছেন। রংপুরের তৈরি শতরঞ্জি ও বেনারসি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। রংপুর ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, বিসিক শিল্পনগরীতে রয়েছে আরএফএলসহ ২৭টি কারখানা। স্থানসংকুলান না হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে শতরঞ্জি, বেনারসি, পাপোশ কোম্পানি গড়ে তুলেছে। শতরঞ্জি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কারুপণ্যের স্বত্বাধিকারী শফিকুল আলম সেলিম জানান, তার ৬টি কারখানায় ১০ হাজারে বেশি নারী-পুরুষ কাজ করছেন। তার কারখানার উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের ৩৬টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। শতরঞ্জি পল্লী লিমিটেডের মালিক রফিকুল ইসলাম দুলাল জানান, পূর্বপুরুষের পেশা শতরঞ্জি উৎপাদন। এগুলো স্থানীয়ভাবে বিপণন করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা কষ্টসাধ্য। সরকারিভাবে রপ্তানির সুযোগের দাবি জানান তিনি।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক বছরে জয়পুরহাটে ক্ষুদ্র শিল্পের বেশ প্রসার ঘটেছে। বিশেষ করে পোলট্রি-শিল্পের বিকাশ বেশি লক্ষণীয়। গত পাঁচ বছরে ছোট-বড় ৩২টি মুরগির বাচ্চা ফুটানোর হ্যাচারি, ১১টি পোলট্রি ফিড মিল ও ৬ হাজার মুরগির খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জেলার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি বেলায়েত হোসেন লেবু জানান, গ্যাস সরবরাহ ও ব্যাংক ঋণ সহজ হলে আরও উদ্যোক্তা শিল্প কারখানায় উৎসাহী হবেন।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক বছরে চা চাষে বিপ্লব ঘটছে পঞ্চগড়ে। জেলায় ৫ হাজার একর জমিতে বছরে প্রায় ১৫ লাখ কেজি চা উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর এর পরিমাণ বাড়ছে। এ জেলায় চা উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী জড়িত। চা চাষের মাধ্যমে ওই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা আমূল বদলে গেছে।

গাড়ির বডি নির্মাণ শিল্প :  যশোর শহরের মনিহার সিনেমা হলের সামনে থেকে শুরু করে যশোর-খুলনা মহাসড়ক ধরে দুই পাশে অসংখ্য অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ চোখে পড়ার মতো। যশোরে এ রকম ছোট-বড় ৩ হাজারের মতো ওয়ার্কশপ রয়েছে। এর মধ্যে অটোমোবাইল মালিক সমিতির সদস্য সংখ্যা ৮০০। সমিতির নেতারা জানান, নতুন-পুরান মিলিয়ে প্রতি মাসে যশোরে সাড়ে চারশ বাস ও ট্রাকের বডি নির্মাণ হচ্ছে। সে অনুযায়ী বছরে এসব ওয়ার্কশপে সাড়ে ৫ হাজার বাস-ট্রাকের বডি নির্মাণ হচ্ছে। এর বাইরে কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের বডিও নির্মাণ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পে যশোরে লেনদেন হচ্ছে ৬০০ কোটি টাকারও বেশি। এসব ওয়ার্কশপে হিনো, অশোক লেল্যান্ড, টাটা, এইচআর, মাজদা কোম্পানির বাস-ট্রাকের বডি বেশি নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া হস্তশিল্পের পাশাপাশি পাথর ভাঙা মেশিন রপ্তানিতেও খ্যাতি রয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী : ব্যক্তি উদ্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে তোলা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন ঘর-গেরস্থালির মধ্যে জীবন বেঁধে রাখা নারীরাও এখন অবসর সময়টুকু উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করছেন। লালবাগের রহমতগঞ্জ এলাকার বেশ কয়েকটি প্রসাধনী কারখানা শতভাগ নারী কর্মী দ্বারা পরিচালিত। নারী উদ্যোক্তারা জানান, খুব অল্প সময়েই নারী কর্মীরা প্রসাধনী প্রস্তুত, প্যাকিং ও আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ড রপ্ত করতে সক্ষম। এ ছাড়া তারা কাজের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক।

Share

আরও খবর