বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর১ আগস্ট, ডেস্ক রিপোর্টঃ বেদনা-বিধুর আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। বছর ঘুরে শোকাবহ আগস্টের শুরুতেই হৃদয়-মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। মানসপটে ভেসে ওঠে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শত-সংগ্রামের দীপ্তিতে ভাস্বর জ্যোতির্ময় মুখাবয়ব। বঙ্গবন্ধু বাঙালির নয়নের মণি। আর তাই প্রতি বছর আগস্ট মাসে বাঙালি জাতি শোকবিহ্বল হয়ে ওঠে। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পর ইতোমধ্যে চারটি দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। কলঙ্কমুক্ত হয়েছে বাঙালির ইতিহাস। ভারমুক্ত হয়েছি আমরা।

বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে অনেক স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। আজ এই পড়ন্ত বেলায় কত কথা, কত স্মৃতি মনের চারপাশে ভিড় করছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ দেখা ১৪ আগস্ট। আমার বাসা ছিল ধানমন্ডিতে। এখন যেখানে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়, তার পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের বাসভবন—সেটিই তখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের বাসভবন। প্রতিদিনের মত সকাল বেলা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যাই। সেদিন সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে গিয়েছিলাম। দিনের কাজ শেষে দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে বসে একসঙ্গে খেয়েছি। বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর খাবার যেত। শ্রদ্ধেয় ভাবি ফজিলাতুন্নেছা মুজিব—যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গী; সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে যিনি বঙ্গবন্ধুকে যত্ন করে রাখতেন, নিজ হাতে রান্না করে বঙ্গবন্ধুকে খাওয়াতেন! খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিলেন। বিকাল ৫টায় প্রথমে সাক্ষাৎ করলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূতের সাথে। তারপর পুরনো গণভবনের মাঠে হাঁটলেন অনেকক্ষণ। সাংবাদিক এবিএম মূসা—কিছুদিন আগে যিনি মারা গেছেন—তার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করলেন। এরপর এসে গণভবনে নিজ কক্ষে বসলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় প্রতিদিন বিকেলে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে দৈনন্দিন রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন। একসঙ্গে চা পান করতেন। এরপর রাত ৮টায় নিজ বাসভবনে ফিরতেন। বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় আসতাম। যেতামও একসাথে, আসতামও একসাথে। গণভবনে যেখানে বঙ্গবন্ধুর অফিস ছিল সেখানে তিনি দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিস করতেন। গণভবনের পাশে এখন যেখানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস, সেটি ছিল বঙ্গবন্ধুর অফিস। বঙ্গবন্ধুর অফিস কক্ষের পাশেই আমার দপ্তর। সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগ্ম সচিব মনোয়ারুল ইসলাম ও ব্যক্তিগত সচিব ফরাসউদ্দীন পিএইচডি করতে বিদেশ যাবেন, সে উপলক্ষে কর্মকর্তাদের নৈশভোজ ছিল। নৈশভোজ শেষে তাদেরকে বিদায় দিয়ে আমি আবার ৩২ নম্বরে এলাম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তখন খাবার টেবিলে। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘কাল সকালে আমার বাসায় আসবি। তুই তো ডাকসুর ভিপি ছিলি। তুই আমার সাথে তোর প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাবি।’ আজ সবকিছু ছাপিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কেবলই মনে পড়ে ১৪ আগস্ট সেদিনটির কথা। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার যাওয়ার কথা ছিল। আমার আর যাওয়া হয়নি।

অতি সাধারণ জীবন ছিল বঙ্গবন্ধুর। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েও সরকারি বাসভবনে থাকতেন না। নিরাভরণ, ছিমছাম আর আটপৌরে ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। ধানমন্ডিতে যখন প্লট বরাদ্দ দেয়া হয় তখন ভাল একটি প্লট নেয়ার জন্য সকলের শত অনুরোধ সত্ত্বেও বলেছিলেন, ‘আগে সবাইকে দাও, তারপর যদি থাকে তখন দেখা যাবে।’ নিজের জন্য কিছুই চাইতেন না। অপরের দুঃখ-কষ্টের প্রতি অপরিসীম দরদ তাকে সর্বদাই আবেগাপ্লুত করত। একবার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে—আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে।’ নিরন্ন-হতদরিদ্র-মেহনতি মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর প্রগাঢ় ভালবাসা প্রতিফলিত ও অভিব্যক্ত হয়েছে তার প্রতিটি কর্মে এবং চিন্তায়। ’৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর, আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের বিখ্যাত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দু ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে।’

’৭১-এর রক্তঝরা মার্চের ১৭ তারিখ ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে ব্যথাভারাতুর কণ্ঠে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না-আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এদেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যেকোন মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু।’ কত বিশাল হূদয়ের মহৎ মনের অধিকারী ছিলেন তিনি। নিজের সবকিছুই তিনি জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে শপথনামা পাঠকালে সমস্বরে আমরা বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ আমরা জানি না। কিন্তু যতদিন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি এবং তোমাকে মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে আমাদের চেতনায় বন্দী মুজিব ছিলেন মুক্ত মুজিবের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। যারা ষড়যন্ত্রকারী তাদের হোতা খুনি মুশতাক তো তখনই আমাদের কাছে প্রশ্ন তুলেছিল, ‘জীবিত মুজিবকে চাও, না স্বাধীনতা চাও।’ আমরা বলতাম, ‘আমরা দু’টোই চাই। স্বাধীনতাও চাই, বঙ্গবন্ধুকেও চাই।’ ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর চার লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু মুজিবকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির পর ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে চিরাচরিত ভঙ্গিতে ‘ভায়েরা আমার’ বলে উপস্থিত জনসমুদ্রের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। হূদয়ের সবটুকু অর্ঘ্য ঢেলে আবেগঘন ভাষায় বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। ভায়েরা, তোমাদেরকে একদিন বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আজকে আমি বলি, আজকে আমাদের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঘরে ঘরে কাজ করে যেতে হবে।’ রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোন ধর্ম ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। এদেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘গত পঁচিশে মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসে বর্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে। বিশ্বকে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম কুকীর্তির তদন্ত অবশ্যই করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব কুকীর্তির বিচার করতে হবে।’ আজ তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ও নির্দেশে জাতির নিকট প্রদত্ত জাতির পিতার অঙ্গীকার আমরা পরিপূরণ করে চলেছি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু সবসময় জাতীয় ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিতেন। সমমনা সকলকে সঙ্গে নিয়ে একত্রে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ গড়ার অঙ্গীকার ছিল তার। নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক রাজনীতিই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য। ’৭৫-এ বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘আই বিলিভ ইন পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নট এ নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ।’ জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে যখন তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন তখন দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমার পার্টিতে আপনারা যারা আছেন, আসুন আমরা পজিটিভ অ্যাপ্রোচ নেই।’ নিজ জীবনের উদাহরণ টেনে সেদিনের বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন, ‘‘আমি যখন খুব ইয়ং ছিলাম; আমার নেতা সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে কেউ গালাগালি করলে আমি রাগ করে তার কাছে যেতাম। তিনি হেসে বলতেন, ‘থাক বলতে দাও। ওতে কি হবে?’ উনি আমাকে বলেছেন, ‘থিংক ফর এ পজিটিভ অ্যাপ্রোচ দ্যান এ নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ।’ আমার লাইফকে আমি ঐ দৃষ্টিতেই দেখেছি।”

৬ দফা আন্দোলনের উদাহরণ টেনে একই বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু আমাদের উদ্দেশ্যে আরও বলেছিলেন, ‘যখন আমি ৬ দফা দিলাম, আমার বিরুদ্ধে বক্তৃতা আরম্ভ করল সকলে মিলে। আমি কিন্তু কারও বিরুদ্ধে কোন কথা বললাম না। আমি চলে গেলাম দেশের মানুষের কাছে। গিয়ে ৬ দফার প্রচার আরম্ভ করে দিলাম। আমি যখন পার্টি রিভাইভ করলাম, আমার বিরুদ্ধে বক্তৃতা হল। কিন্তু আমরা চলে গেলাম পিপলের কাছে। পিপল আমাকে গ্রহণ করে নিল। কাউকে গালাগালি করে লাভ নাই।’ বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য বছরের পর বছর কারান্তরালে জীবন কাটিয়ে, দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করেছেন জাতির জনক। নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘বহুদিন রাজনীতি করেছি। ১৮ বছর বয়স থেকে। তখন বোধহয় ১৯৩৮ সাল। তারপর চোঙ্গা মুখে দিয়ে রাজনীতি করেছি, রাস্তায় হেঁটেছি, ফুটপাতে ঘুমিয়েছি। সেই রাজনীতি থেকে আজ এ পর্যন্ত এসেছি। আমি বলতে চাই না যে আমি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকে আমি চোঙ্গা ফুঁকেছি, সাইকেলে ঘুরেছি, গ্রামে গ্রামে ঘুরে রাজনীতি করেছি।’ কর্মই ছিল তার জীবন। দেশের মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালবাসা ছিল বঙ্গবন্ধুর। সপরিবারে জীবন দিয়ে সেই ভালোবাসার মূল্য দিয়েছেন।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। ইতিহাসের নৃশংসতম ও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পরপরই সকালে আমাকে প্রথমে গ্রেফতার করে গৃহবন্দী করে, সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত আমার বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে দেয়া হয়নি। আমার সঙ্গে তখন বাসায় অবস্থান করছিলেন ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুদ্দীন আহমেদ মিয়া। তিনি ভোলা জেলা বাকশালের সেক্রেটারি ছিলেন। দু’দিন পর ১৭ তারিখ খুনিচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল অভ্যুত্থানকারী আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। খুনিচক্র মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায় ও আমার উপর নির্মম নির্যাতন করে। ভয়াবহ সেই নির্যাতনের ক্ষত এখনও আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। খুনিরা সেদিন আমায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে নানারকম ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। আমি ঘাতকচক্রকে শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধু যা ভাল করেছেন আমি তার সাথে ছিলাম, যদি কোন ভুল করে থাকেন তার সাথেও ছিলাম। এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারব না।’ আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে প্রথমে গ্রেফতার ও পরে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে সম্মত করতে না পেরে নৃশংসভাবে হত্যা করে তারা।

আজ শোকবহ আগস্টের শুরুতে কেবলই মনে পড়ে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের শেষাংশটি-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ রাজনৈতিক মুক্তি আমাদের অর্জিত হয়েছে। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, সংবিধান, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা পেয়েছি। বহু ত্যাগের বিনিময়ে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছি। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে, আর তার ভালোবাসার হতদরিদ্র দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ইতিমধ্যে আমরা মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, আজ বঙ্গবন্ধু নাই। কিন্তু তার রক্ত যার ধমনীতে প্রবাহিত, যে রক্ত আপোষহীন, যে রক্ত পরাভব মানে না, যে রক্ত হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে জানে-সেই রক্ত ও চেতনার সার্থক উত্তরাধিকার বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কতিপয় যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাংলার মানুষকে জাতির পিতা যেমন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আজ বঙ্গবন্ধু কন্যাও তেমনি বাংলার মানুষকে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আশা করি, ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশকে প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে দলমত নির্বিশেষে সকলকেই আমরা এ মহতী কর্মের মহান ব্রতে শামিল করতে সক্ষম হব।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

Share

আরও খবর