৩ ডিসেম্বর, অনলাইন ডেস্কঃ কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দেশের তৈরি পোশাক খাত।  প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাজার দখলের হুমকির মাঝে দেশের ব‌্যাংকঋণে উচ্চসুদ ও অসহযোগিতার কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে চলতি বছরেই বন্ধ হয়েছে ৬০টি তৈরি পোষাক কারখানা। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের বেতনভাতা, মজুরি এবং অফিসের ব্যয় বহন করতে না পারায় অর্ধশতাধিক কারখানা শুধু বন্ধ হয়নি, চাকরি হারিয়েছেন ২৯ হাজার ৫৯৪ জন শ্রমিক।

গার্মেন্টস খাতের এ অবস্থা সামগ্রিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে এ সংকট কাটাতে পোশাক খাতে বাড়তি প্রণোদনা চায় তৈরি পোশাক খাতের সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যানুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৯৬ শতাংশ বা ১২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩৪ শতাংশ বা ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। দেখা যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত এই খাতের প্রবৃদ্ধি কমছে। বিগত পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ ও ইউরোপের বাজারে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ পোশাকের দরপতন হয়েছে। সর্বশেষ অক্টোবর নাগাদ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি অনেক কম।

অন্যদিকে ভিয়েতনামের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ভারতের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২৫ শতাংশ, পাকিস্তানের জুলাই ও আগস্ট মাসের গড় প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ আর বাংলাদেশের শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, ‘কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আর্থিক অসচ্ছলতাকে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে আর্থিক সমস‌্যার কারণে দেশের ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ২৯ হাজারের বেশি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। আমাদের এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক কারখানা মালিকরা ঠিকভাবে দরকষাকষি করতে পারছে না পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে। অনেকে আবার অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতে চরম দুরবস্থা চলছে। একের পর এক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটা কিন্তু আমরা সামলাতে পারছি না। তাই বায়ারদের উপর সমন্বিতভাবে চাপ দিতে হবে।’

তবে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার ফলে অনেক শ্রমিক বেকার হলেও কোন কারখানা থেকে শ্রমিক বা কর্মী ছাটাই করা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

এছাড়া ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার ও অসহযোগিতায় বন্ধ হচ্ছে একের পর এক তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক। পাশাপাশি বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে না পারা, শ্রমিক বিক্ষোভ ও শেয়ার্ড বিল্ডিং ব্যবহারের মতো নানা কারণেও এসব কারখানা বন্ধ হচ্ছে বলেও জানান তারা। 

তারা আরো বলেন, গত জানুয়ারিতে শ্রমিকদের যে বেতন বেড়েছে, সে অনুযায়ি বেতন না দিতে পেরে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারী কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে৷ কিছু বড় কারখানাও লে অফে বাধ্য হয়েছে৷ এর সাথে বাজার মন্দা, পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়া, দাম কমে যাওয়া অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

এদিকে পোশাক খাত সত্যিই সংকটের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে স্বীকার করে গার্মেন্টস নেত্রী মোশরেফা মিশু জানান, ‘আজকে আমরা মিটিং করতে যাচ্ছি এ বিষয় নিয়ে। সেখান থেকে একটা সিদ্ধান্ত নিব, আমাদের পক্ষ থেকে কী করনীয় এ সকল শ্রমিকদের বিষয়ে। তবে আমরা দাবি জানাচ্ছি মালিকদের কাছে যে, সমস্ত শ্রমিক ইতোমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য। না হলে তাদের পরিবারগুলোর কী হবে? কারণ বেশীরভাগ মালিকের অনেকগুলো কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে একটা কারখানা বন্ধ হলেও চাইলে শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা সম্ভব। কিছু হয়ত রয়েছে ছোট কারখানা বা একটি কারখানা দিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করত, তাদের বিষয়টি আলাদা। আর শুধু মাত্র আর্থিক কারনেই যে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমরা সেটা মানিনা। কিছু কারখানা যখন তৈরি করা হয়েছিল, তখনই তারা কারখানার অবকাঠামোগুলো ঠিকভাবে গড়ে তুলেনি। তাই এই প্রতিযোগিতার বাজারে এখন তারা টিকে থাকতে পারছে না। এ বিষয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলো সহযোগিতা করতে পারে। তারা চাইলে আর্থিকরণ করে পরিচালনা করতে পারেন। ‘

তথ্য মতে, পোশাক খাতে প্রণোদনা হিসাবে ভারত সরকার রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক খাতের জন্য রেইমবারসমেন্ট অব ট্যাক্সেস অ্যান্ড ডিউটিস ফর এক্সপোর্ট প্রমোশন স্কিম বাবদ ৫০ হাজার কোটি রূপি বরাদ্দ করেছে এবং এই শিল্পের উপর আরোপিত গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্সেস সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করেছে। আর ভিয়েতনাম সরকার তাদের পোশাক শিল্পের জন্য করপোরেট কর প্রথম ৪ বছরের জন্য শতভাগ, পরবর্তী ৯ বছরের জন্য ৫০ ভাগ এবং পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য ১০ ভাগ রেয়াত দিয়েছে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য এক্সপোর্ট রিফাইনেন্সিং স্কিমের আওতায় ৭.৫ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করেছে।

প্রসঙ্গত, নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি নগদ ৪ শতাংশ সহায়তা দিচ্ছে সরকার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে নগদ সহায়তা/ ভর্তুকির উপর উৎসে কর ৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশে ধার্য করা হয়েছে, সহায়তার অর্থকে কোন প্রকার করের আওতামুক্ত রেখে এই ১০ শতাংশ আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

এছাড়াও সরকার কর্তৃক স্বীকৃত ও গেজেটকৃত ও ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের আওতাধীন বিবেচনা যোগ্য ১৩৩টি রুগ্ন শিল্পকে সম্পূর্ণ মূল ঋণ (২৩৮.৪৯ কোটি টাকা) এবং সকল আরোপিত ও অনারোপিত সুদ ও কস্ট অব ফান্ডসহ সকল চার্জ মওকুফ করা। বিপর্যস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের সুরক্ষার জন্য ঋণ পুনঃতফসিলি করনের মেয়াদ দ্বিগুণ করা এবং বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের প্রস্তাবনা দিয়েছে বিজিএমইএ।

Share

আরও খবর