৭ মার্চ, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের বিস্ময়কর উত্থান হয়েছে। সম্ভাবনাময় উদীয়মান এক শিল্পখাত এটি। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রপ্তানি করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড (বিপিএল) নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে দেশের ওষুধ শিল্প। স্বাধীনতার ঠিক পরে ৭০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো। কিন্তু বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে বিশ্বের ১২৭টি দেশে মানসম্মত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার ওপরে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ৬৫০ কোটি টাকারও বেশি। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশের উপরে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন গার্মেন্ট শিল্পের মতোই এ শিল্পের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি), বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বিএএসএস) ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির (বিএপিআই) প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্প মূলধন ও ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখায় বিদেশি বাজারে দেশীয় ওষুধের চাহিদা বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ওষুধের দাম অনেক কম। বিশ্বের ১২৭টি দেশে উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ওষুধ-বাণিজ্যের ১০ শতাংশ দখল করা সম্ভব। এতে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

ওষুধ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও এই শিল্পের সুস্থ বিকাশ ও মানসম্মত উৎপাদনশীলতার জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে, আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এ খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সঙ্গে এই খাতে ২ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ খাতে এসব অর্জনের পেছনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশকিছু কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ অন্য দেশে ওষুধ রপ্তানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব-বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধ শিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এর বিকাশ সামনে আরো বাড়বে বলে মনে করেন তারা। তবে সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ধরা হচ্ছে- ‘কাঁচামাল উৎপাদন’। আর এ কারণে ওষুধ শিল্পের অপার সম্ভাবনার সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছিলো না বাংলাদেশ। তবে সে দুয়ারও খুলে যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অবস্থিত ওষুধ শিল্পনগরী প্রকল্পের (এপিআই শিল্পপার্ক) প্লট বরাদ্দ শেষ পর্যায়ে। এই পার্কে কাঁচামাল উৎপাদনের সব ধরনের সুবিধা প্রণয়ন করে দেবে সরকার। এরপরই সেখানে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা স্থাপন শুরু হবে। ফলে আমদানি খরচ শতকরা ৭০ ভাগ কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি শেষ হওয়া এশিয়া ফার্মা প্রদর্শনীতে ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্কে প্লট বরাদ্দ শুরু হয়েছে। পার্ক পূর্ণাঙ্গ চালু হলে ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের জন্য আর কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। বরং আমরাই উল্টো কাঁচামাল রপ্তানি করতে পারবো। তাই এপিআই শিল্পপার্কে দ্রুত গ্যাস সংযোগের দাবি করেন তিনি।

এসব দাবির বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের দাবিকে যৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করেন। এ দাবি পূরণে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

ওই প্রদর্শনীতে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প সবদিক দিয়ে পরিপক্বতা অর্জন করেছে। মান বেড়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রণও উন্নত হয়েছে। এখন ওষুধ শিল্প উড়াল দেয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের ১০-১২টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে ওষুধের রপ্তানি বাজার ১৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর ১০ শতাংশ ধরা গেলে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার হবে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বাংলাদেশের চাহিদার ৯৮ ভাগ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশীয় ৫৪টি ওষুধ কোম্পানি ১২৩টি দেশে মোট ৮৩৬ কোটি ৮১ লাখ টাকার ওষুধ রপ্তানি করেছে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এখনো দেশের অধিকাংশ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার ১২০০ কোটি টাকার মতো। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কাঁচামাল উৎপাদন করছে। এ পর্যন্ত ৪১টির বেশি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। ইতিমধ্যে বেক্সিমকো, স্কয়ার, অপসোনিন, ইনসেপ্টা, একমিসহ ৩৫টি প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল উৎপাদন করছে।

অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য মতে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১ হাজার ৩৩৮টি ছোট-বড় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। বিশেষ করে বেক্সিমকো, স্কয়ার, গ্লাক্সো, রেনেটা, ইনসেপটা, হেলথ কেয়ার, এসকেএফ, সেনডোজসহ বেশকিছু কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হয়। দেশের উন্নতমানের ৫৪টির বেশি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রুপের ওষুধ রপ্তানি করে। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিশ্বমানের ৫৪টি ওষুধ কোম্পানির কারখানাতে উৎপাদিত ৮৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৭ টাকার ওষুধ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ১২৭টি দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছিল।

জানা যায়, দেশের ২৭৮টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে। এছাড়া দেশের ২৬৬টি ইউনানী, ২০৫টি আয়ুর্বেদিক, ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ও ৩২টি হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে।

ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) পর্যন্ত ২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার রপ্তানি করা হয়। যা চলতি বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার রপ্তানি করা হয়। যা এর আগের বছরের তুলনায় ২.৭৭ শতাংশ বেশি। ইপিবি তথ্য মতে, ২০১১-১২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় ছয় কোটি ডলারের, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় সাত কোটি ডলারের ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি ওষুধ আমদানি করতে হতো। এখন সেটা অনেক কমে এসেছে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৯টি ছোট-বড় ওষুধ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি ওষুধ কারখানা সচল রয়েছে। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। যার মধ্যে বড় ১০টি কোম্পানি দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বড় ২০টি কোম্পানি বিবেচনায় নিলে তারা মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ সরবরাহ করছে। আর ৪০টি কোম্পানি ১৮২টি ব্র্যান্ডের সহস্রাধিক রকমের ওষুধ রপ্তানি করে। সমিতির তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৩ লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিটফোর্ড ছাড়া খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আরো ৫টি বড় ওষুধের মার্কেট রয়েছে।

ওষুধ শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের শুরুতে, একাত্তরের স্বাধীনতার কিছুদিন পর বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদন শুরু করে। তখন এ শিল্প এতটা উন্নত ছিল না। শুরুতে মোট চাহিদার মাত্র ২০ ভাগ বাংলাদেশ উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল, আর ৮০ ভাগই নির্ভর করতো বৈদেশিক আমদানির ওপর, বিশেষ করে পাকিস্তানের ওপর।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫২৫ ধরনের ওষুধ আমদানির জন্য গত বছরের ২৩শে জুন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে শ্রীলঙ্কা। একই সঙ্গে গত বছরের ২৩শে সেপ্টেম্বর বেলারুশ ওষুধ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এছাড়া এ বছরের গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।

ওদিকে প্রথম বাংলাদেশি কোম্পানি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানিতে বেক্সিমকো ফার্মা (বিপিএল) নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে দেশের ওষুধ শিল্প। হাইপারটেনশনের ওষুধ কার্ভোডিলল মার্কিন বাজারে রপ্তানি শুরু করেছে কোম্পানিটি। গত বছর রাজধানীর একটি হোটেলে অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাটের হাতে আমেরিকায় রপ্তানিকৃত হাইপারটেনশনের (কার্ভোডিলল) ওষুধের প্রথম চালান তুলে দেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমান। ওই অনুষ্ঠানে সালমান এফ রহমান বলেন, বেক্সিমকো ফার্মা একটি মাইলফলক অর্জন করলো। অচিরেই বাংলাদেশ প্রভাবশালী রপ্তানিকারক হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করবে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ থেকে আমরাই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রপ্তানি শুরু করেছি। যুক্তরাষ্ট্র ওষুধের জন্য একটি বড় বাজার। সেখানে ওষুধ রপ্তানির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি আমরা। এটা শুধু আমাদের জন্য নয়; দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

Share

আরও খবর