মুশফিক২৭ মে, স্পোর্টস ডেস্কঃ দশ বছর আগে কলেজে পড়তেন। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বয়স মাত্র ১৮ হয়েছে। সেই ছেলেটাকে নিয়ে ফারুক আহমেদ ‘জুয়া’ খেললেন!’ক্রিকেটের স্বর্গ’ লর্ডসে খেলতে নামলেন কলেজ পড়ূয়া এক ক্রিকেটার। সেদিন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। তবুও প্রধান নির্বাচক জুয়াটা খেলেছিলেন। ফল পেতে সময় লাগেনি। মুশফিকুর রহিম আজ বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দশ বছর কেটে গেল মুশফিকুর রহিমের। মুশফিক নিশ্চয় ফিরে যেতে চাইবেন লর্ডসের সেই দিনটিতে। ক্যারিয়ারের এক দশক পূর্তিতে মুশফিক ফেসবুকের অফিসিয়াল পেজে একটি ভিডিও বার্তায় সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজকের এই দিনে ১০ বছর আগে বাংলাদেশের হয়ে আমার অভিষেক হয়েছিল। এটা এক দীর্ঘ যাত্রা। মনেপ্রাণে চেষ্টা করেছি ভালো কিছু করতে। এ যাত্রায় আমার সঙ্গে থাকার জন্য বাবা-মা, ভাইবোন ও পরিবারের সদস্যদের জানাই ধন্যবাদ। আমার বন্ধু বগুড়া, বিকেএসপি, জাহাঙ্গীরনগরে যারা ছিল, তাদের বিশেষ ধন্যবাদ। কোচ-শিক্ষকরা যারা ছিলেন, তাদের ধন্যবাদ। সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ বাংলাদেশের মানুষদের, যারা সবসময় আমার এবং আমাদের দলের সঙ্গে ছিলেন। এভাবেই আমাদের সমর্থন করতে থাকুন। ইনশাল্লাহ আমরা এর প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করব।’

এ লম্বা যাত্রাটা অবশ্য মুশফিক যেনতেনভাবে কাটাননি। বাংলাদেশ যে অর্থে ‘টাইগার’ ডাক নামে খ্যাত, সেই অর্থে খুব কম ক্রিকেটারকেই এ খ্যাতিটা দেওয়া যায়। তবে, মুশফিক আসলেই দলের ডাকনামের এক সার্থক প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে ধারাবাহিক ক্রিকেটারদের একজন মুশফিক। সবচেয়ে পরিশ্রমী, সবচেয়ে অধ্যবসায়ী ক্রিকেটারও তিনি। সাকিব আল হাসান বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। তবে, ব্যাটসম্যান কাম উইকেটকিপার হিসেবে যদি অলরাউন্ডারদের তালিকা করা যায় তাহলে বাংলাদেশের মুশফিক অনেক ওপরেই থাকবেন।

লর্ডসে মুশফিকের সেই অভিষেক টেস্টে হার্মিসন, ফ্লিনটফ, সজোন্স, হগার্ডদের বিপক্ষে এবং সেই কন্ডিশন-উইকেটে বাংলাদেশ প্রথম দিনেই মাত্র ১৭ ওভারেই ৬৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে। তখন ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের শুরুর দিক। হরহামেশা এমনটাই হতো! গুটি গুটি পায়ে ছোট্ট মুশফিক ব্যাট করতে নামলেন। ঠিক ওই মুহূর্তে প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের অনুভূতিটা শুনুন ‘যখন ও মাঝমাঠে হেঁটে যাচ্ছিল, আমার অনুভূতিটা ছিল মিশ্র। ওরা অনেক বেশি বাউন্সার করছিল। আমার মনে হচ্ছিল এসব না ওর কোনো ক্ষতি করে দেয়!’ ক্ষতি করেনি। মুশফিক ৮৫ মিনিট উইকেটে থেকে ৫৬ বল খেলে ১৯ রান করলেন। ওই শুরু … এরপর ফারুক আহমেদের অনুভূতিটা হলো ‘ও অনেক সাহস দেখিয়েছে। পরের অনুভূতিটা অনেক ভালো ছিল।’

এই ফারুক আহমেদই মুশফিককে নিয়ে আরেকটা ‘জুয়া’ খেলেছিলেন ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ খালেদ মাসুদকে বাদ দিয়ে উইকেটকিপার হিসেবে দলে নিয়েছিলেন মুশফিককেই। সে সময় এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। তবে, বিশ্বকাপ শুরু হতেই সবকিছুতে মুশফিক নিজেই জল ঢেলে দিলেন। ওই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক এক জয় পেয়েছিল। সে সময় অধিনায়ক ছিলেন হাবিবুল বাশার মুশফিকের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক। তিনি মুশফিককে তিনে পাঠিয়ে দিলেন। ১০৭ বলে ৫৬ রান করে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন মুশফিক। ‘পাইলট-যুগে’র রূপকথা ওখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়ে গেল!

মুশফিক বাংলাদেশের উইকেটের পেছনে নিয়মিত দাঁড়ালেন জুলাই ২০০৭ সাল থেকে। সেটা ছিল তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট। সেই সময়ের পর থেকে ক্রিকেটবিশ্ব কমপক্ষে ৪০ ম্যাচ খেলা উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান দেখেছে ছয়জন। সবচেয়ে নিয়মিত দলে থাকাদের একজন হয়েও মুশফিকই খেলেছেন সবচেয়ে কম টেস্ট ৪৩টি! সর্বোচ্চ ৭৭টি ম্যাচ খেলেন ইংল্যান্ডের ম্যাট প্রায়র, ৭৩টি ম্যাচ ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনি, ৬৩টি ম্যাচ অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাড হ্যাডিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক দিনেশ রামদিন খেলেছেন ৫০টি। মুশফিকের কাছাকাছি থাকা শ্রীলংকার প্রসন্ন জয়াবর্ধনে খেলেছেন ৪৯টি টেস্ট। তবে, ব্যাটসম্যান হিসেবে এ তালিকায় মুশফিকের রান চতুর্থ সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ যে কম টেস্ট খেলে, এই পরিসংখ্যানই যেন তার জ্বলন্ত উদাহরণ! দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হয়েও মুশফিকের ক্যারিয়ারের রান তাই তিন হাজার হয় না!

প্রথম দশক তো গেল। আগামী দশকে দিন দিন আরও পরিপকস্ফ হয়ে ওঠা মুশফিকের এসব অবজ্ঞার জবাব দেওয়ার পালা শুরু হলো বলে!

Share

আরও খবর