চর্মরোগএই শীতে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দেয়। একই ভাবে চর্মরোগে আক্রান্তদের সমস্যা যথাযথ পরিচর্যা না হলে রোগের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। শীতে চর্মরোগের মধ্যে অন্যতম একটি স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে শরীরে চুলকানি। এছাড়া শীতে আয়রন ও রাইবোফ্লাভিন-এর অভাবজনিত কারনেও মুখে ঘা হতে পারে। শিশু-কিশোরকে এটোপিক একজিমা, শুষ্ক তক জনিক চর্মরোগ, তক কেটে যাওয়া জনিত সমস্যা, ধুলবালি, বাস থেকে এলার্জিজনিত চর্মরোগসহ নানা ধরনের চর্মের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যা নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন।

এঙ্গুলার কেলাইটিস (মুখের কোনায় ক্ষত)ঃ
মুখের কোনায় ক্ষত সৃষ্টি হওয়া। বিশেষ করে শীতে বেশী হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শরীরে আয়রন ও রাইবোফ্লাভিন ভিটামিন-এর স্বল্পতা মুখের কোনায় ক্ষতের অন্যতম কারণ। তবে ক্যানডিডা ইনফেকশন, কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস থেকেও মুখের কোনায় ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সমস্যা থেকে যায়। ফলে মুখের মধ্যে অস্বস্তির চেয়ে বেশী সমস্যা হয় সৌন্দর্য রক্ষায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেকে লিপিস্টিক দিয়ে ক্ষত স্থান ঢেকে দেন। ফলে লিপিস্টিক বা প্রশাধনের কেমিক্যাল সমস্যাকে আরও তীব্রতর করে।

প্রতিকারঃ মুখের কোণায় ক্ষত হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। তবে বাইবোফ্লাভিন ট্যাবলেট সেবন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টপিক্যাল মিকোনাজল, স্বল্পমাত্রায় স্টেরয়েড দেয়া যেতে পারে। তবে এ ধরনের ওষুধ কেবল বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নেয়া উচিৎ।

এটোপিক একজিমাঃ
এটোপিক একজিমা। এ ধরনের চর্মরোগ শিশুদের বেশী হয়ে থাকে। শতকরা ১০ থেকে ২০ ভাগ শিশু-কিশোর এ রোগে আক্রান্ত হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটোপিক একজিমার তীব্রতা কমতে থাকে। এ ধরনের স্কিন সমস্যার বড় দিক হচ্ছে শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, শিশু সারাক্ষণ অস্থির থাকে এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে দানাদানা হয়। এসব স্থানে অত্যাধিক অত্যাধুনিক চুলকায়। চুলকালে অধিক ক্ষতের সৃস্টি হয় এবং সংক্রান্ত স্থানের চামড়া পুরু হয়ে যায়।

প্রতিকারঃ
=> যেসব কারনে এটোপিক একজিমা তীব্র হয় সেসব উপাদান পরিহার করা যেমনঃ উল ও সিনথেটিক কাপড় পরিহার করতে হবে। শিশুকে ঢিলে ঢালা সূতির কাপড় পরাতে হবে। যেসব খাবারে এনার্জি হয় তা পরিহার করতে হবে।

=> শিশুকে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করাতে হবে এবং এক্ষেত্রে মাইন্ড সোপ (ডোব) অথবা সাবানের বিকল্প সোপ ফ্রি উপাদান ব্যবহার করতে হবে। শিশুকে অন্ততঃ দিনে ২ বার পর্যাপ্ত ময়েশ্চারাইজারযুক্ত লোশন সারা শরীরে লাগাতে হবে।

=> প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে স্বল্প মাত্রার ষ্টেরডে ক্রিম সীমিত ব্যবহার করা যেতে পাবে।

=> শিশু যাতে রাতে ঘুমাতে পারে তার জন্য সিডেটিং এন্টি হিস্টাসিন দিতে হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদী হিস্টাসিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নন-সিডেটিং অর্থাৎ কম ঘুমের এন্টি-হিস্টাসিন ব্যবহার করতে হবে।

=> যদি এটোপিক একজিমার স্থানে ক্ষতের কারণে ইনফেকশন হয় তবে উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক ক্রীম। অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করতে হবে।

স্কাবিস বা চুলকানিঃ
চুলকানি এক ধরনের প্যারাসাইটিক ইনফেকশন। এ ধরনের ত্বকের সমস্যায় সারা শরীর চুলকায়। বিশেষ করে রাতে চুলকানি বাড়ে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও চুলকানি হতে পারে। এটা এক ধরনের ছোয়াচে রোগ। গণবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ, বয়স্ক লোক, শিশু-কিশোর এবং সক্ষম পূর্ণ বয়স্ক লোকদের চুলকানি সমস্যা বেশী হয়।

এ রোগ হলে সাধারণত ছোট ছোট দানার মত দেখা যায় আঙ্গুলের ভাজে, হাতের কবজির ভাজে, কনুই, জেনিটেলা ইত্যাদি স্থানে। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে একজিমা ও স্কাবিস দেখতে প্রায় একই রকম। ফলে রোগ নির্ণয় করতে ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে। ফলে অনেক রোগী ভুল চিকিৎসার শিকার হয়। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞগণ স্কাবিস ও একজিমার পার্থক্য বুঝতে পারেন।

প্রতিকারঃ
=> স্কাবিস চিকিৎসায় স্কাবিসিডাল লোশন অথবা ক্রিম ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে পারমেথ্রিন ৫০% ক্রিম কার্যকর উপিক্যার স্কাবিসাইড।

=> রাতে ক্রিম ঘাড় থেকে শুরু করে পায়ের পাতা পর্যন্ত লাগাতে হবে। সকালে ধুয়ে ফেলতে হবে। এক সপ্তাহ পর পুনরায় একই নিয়মে চিকিৎসা অধিক ফলদায়ক।

=> স্কাবিস প্রতিরোধে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও চিকিৎসা দিতে হবে।

=> আক্রান্ত ব্যক্তির সকল পরিধেয় কাপড় জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

=> তবে এ ধরনের চিকিৎসায় স্কাবিস ভার না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অন্যান্য কার্যকর ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। তাই স্ক্যাবিস হলে ঘরে বসে নিজে নিজে চিকিৎসা করবেন না। শিশু ও বড়দের চর্মরোগে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত।

শুষ্ক ত্বকজনিত চর্মরোগ এবং তক কেটে যাওয়াঃ
এ ধরনের সমস্যা বয়স্ক লোকদের বেশী হয়। মুখ ও হাত পায়ের তক কেটে গেলে সাদা ভ্যাসলিন লাগালে উপকার পাওয়া যায়। তবে ত্বক বেশী কেটে গেলে স্বল্পমাত্র স্টেরয়েড ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া বয়স্ক লোকদের শরীর চুলকানো (জেরোটিক পুরুরাইটাস) সমস্যার ক্ষেত্রে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমান ময়েশ্চারাইজার ক্রীম বা লোশন লাগাতে হবে। বেশী চুলকালে ননসিডেটিভ এন্টি হিস্টাসিন দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি উলও সিনথেটিক কাপড় পরিহার এবং মৃদু ঠান্ডা পরিবেশ থাকা উচিত।

ডঃ এন কে নাতাশা।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ হেল্‌থ সায়েন্স।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
তারিখঃ ৩১/০১/২০১৬

Share

আরও খবর