মা ও শিশুএই গরমে আপনার শিশু সন্তান কি সুস্থ আছে? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তবে ভাল। কিন্তু খেয়াল রাখবেন আপনার শিশুটি যেন অসুস্থ না হয়ে পরে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আপনার আদরের শিশু সন্তান কিন্তু যে কোন সময় অসুস্থ হয়ে পরতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত হতে পারে ডায়রিয়ায়। আর অসুস্থ্ হলে সময় ক্ষেপন না করে চলে যান ডাক্তারের কাছে। মাথা গরম করার কিছুই নেই। কিন্তু কখন বুঝবেন আপনার শিশুর ডায়রিয়া হয়েছে?

সাধারণত প্রতিদিন কমপক্ষে তিনবার বা এর বেশি পাতলা পায়খানা হলে তাকে ডায়রিয়া বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তবে স্বাভাবিক নরম পায়খানা যদি দিনে তিন বা চারবারও হয়, তাকে কিন্তু ডায়রিয়া বলা যায়না।। আবার সে সকল শিশুরা মায়ের বুকের দুধ পান করে, তারাও বারবার নরম পায়খানা করে, সেটিও কিন্তু ডায়রিয়া নয়। মনে রাখবেন, যদি মলের তুলনায় পানির পরিমান বেশি থাকে তখনই বুঝে নিতে হবে আপনার শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও খনিজ লবণ বের হয়ে যায়। তাই এ রোগে পানির ঘাটতি দেখা যায়, যা পানিশূন্যতা বা পানিস্বল্পতা নামে পরিচিত।

ডায়রিয়ার প্রকার

সাধারণত ডায়রিয়া ২ প্রকারের হয়ে থাকে। সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া।

১। সাময়িক ডায়রিয়াঃ ডায়রিয়া শুরু হওয়ার পর ২ কিংবা ৩ দিন স্থায়ী হলে তাকে সাময়িক ডায়রিয়া বলা যেতে পারে।
২। দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়াঃ দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়াও কিন্তু সাময়িক ডায়রিয়ার মতই শুরু হয়, কিন্তু এর ব্যাপ্তি কাল ৭ দিন থেকে ১৪ দিন বা এর চেয়েও বেশি স্থায়ী হলেই তাকে দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া বলা হয়।আর যদি পাতলা পায়খানার সাথে যদি রক্ত মিশ্রিত থাকে, তবে সেটি ডায়রিয়া না হয়ে আমাশয়ও হতে পারে।

সাবধান ডায়রিয়া কিন্তু বিপজ্জনক

ডায়রিয়া কিন্তু মারাত্মক বিপদজনক। বিশেষ করে ছোট এবং প্রবীণদের জন্য। ডায়রিয়ার কারনে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কেননা ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও লবণ বের হয়ে মারাত্মক পানিশূন্যতার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে অপুষ্টির সমস্যায় ভুগছে এমন শিশুর যদি ডায়রিয়া হয় তার অবস্থা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। কারন ডায়রিয়া হলে মলের সাথে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায় এবং পুষ্টি উপাদানেও ঘাটতি পড়ে, তারা ক্ষুধামন্দায়ও ভোগেন। আর এসময় যদি আক্রান্ত রোগীরা পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পান তবে তাদের জীবন শঙ্কার কথা উড়িয়ে দেয়া যায়না।

পানিশূন্যতা বোঝার উপায়

ডায়রিয়া হলে রোগীর সেবাদানকারীকে খুব ভালো করে পানিশূন্যতার দিকটি খেয়াল রাখতে হবে। চিকিৎসকদেরও বিষয়টি জানা থাকতে হবে। পানিশূন্যতা বুঝতে তিনটি পদ্ধতি রয়েছে। যেমন, প্রশ্ন করা, দেখা এবং বোঝা।

প্রশ্ন করতে হবে
রোগী বা তার সেবাদানকারীর কাছ থেকে জেনে নিতে হবে, কতবার পাতলা পায়খানা হয়েছে? কত দিন ধরে পাতলা পায়খানা হচ্ছে? পাতলা পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায় কি না। বমি হয় কি না। বমি হলে কতবার এবং কী পরিমাণ বমি হয়? পানি পান করতে পারে কি না। যদি পানি পান করতে পারে, তবে তা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম কি না।
ভাল করে  দেখতে হবে
শারীরিকভাবে তাকে কেমন দেখায়, সে স্বাভাবিক নাকি বিরক্ত বা অস্থির? নেতিয়ে পড়েছে বা অজ্ঞান হয়ে পড়েছে কি না? অপুষ্টিতে ভুগছে কি না? চোখ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গর্তে ঢুকে গেছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে রোগী ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।
বুঝে নিতে হবে
পেঠের চামড়া কুঁচকে ধরলে তা স্বাভাবিক হতে সাধারণত ২ সেকেন্ড সময় লাগে। কিন্তু পানিশূন্যতা হলে তা স্বাভাবিক হতে বেশি সময় লাগে। যত বেশি সময় লাগবে, তত মারাত্মক পানিশূন্যতায় আক্রান্ত বলে ধরে নিতে হবে।

চিকিৎসা

স্বাভাবিক পানিশূন্যতার রোগীরা বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর খাবার স্যালাইন খেতে হবে।
দুই বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে
* প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ৫০-১০০ মিলিলিটার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।
* যে শিশুরা বুকের দুধ খায়, তাদের ক্ষেত্রে স্যালাইনের পাশাপাশি বুকের দুধ দিতে হবে।
* একসঙ্গে পুরো স্যালাইন খেতে না পারলে অল্প অল্প করে স্যালাইন দিতে হবে।
দুই থেকে ৯ বছর পর্যন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে
* ১০০-২০০ মিলিলিটার (১-২ কাপ) স্যালাইন
খাওয়াতে হবে প্রতিবার পায়খানার পর।
১০ বছর বা এর বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে
* যতটুকু খেতে চায় সেই পরিমাণ খাওয়াতে হবে।
* সঙ্গে স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে।
* যদি বমি করে, ১০ মিনিট অপেক্ষা করে আবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে।
* ডায়রিয়া বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত স্যালাইনের পাশাপাশি অন্যান্য পানীয়ও দিতে হবে।

বেশি পানিশূন্যতায় করণীয়
এ ধরনের রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে এবং কমপক্ষে চার ঘণ্টা চিকিৎসা নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতে যেতে পারবে। এই চার ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে প্রতি কেজি শারীরিক ওজন অনুযায়ী ৭৫ মিলিলিটার স্যালাইন খেতে হবে। অর্থাৎ ৭৫ মিলিূওজন। যেমন, কারো ওজন ২০ কেজি হলে (৭৫২০) মিলি বা ১৫০০ মিলি স্যালাইন চার ঘণ্টার মধ্যে পান করতে হবে।

অন্যান্য চিকিৎসা
* ডায়রিয়া হলে স্যালাইন খাওয়ার পাশাপাশি জিংক ট্যাবলেট খেতে হবে। ছয় মাস বয়সের নিচে ২০ মি.গ্রা.-এর অর্ধেক বড়ি প্রতিদিন একবার অল্প পানি (১ চা চামচ) অথবা বুকের দুধ অথবা স্যালাইনে গুলিয়ে খাওয়াতে হবে ১৪ দিন।
* ছয় মাসের বেশি বয়সের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি করে জিংক বড়ি (২০ মি.গ্রা.) ১৪ দিন খাওয়াতে হবে।
* সাময়িক ডায়রিয়ায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন হয় না। তবে আমাশয় হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে।
* অতিরিক্ত আঁশ জাতীয় খাবার ডায়রিয়া চলাকালীন এড়িয়ে চলাই ভালো। এ সময় এ খাবারগুলো হজমে সমস্যা হয়।
* বেশি চিনি মিশ্রিত খাবার ডায়রিয়ার সময় খেলে পাতলা পায়খানার মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

সে যাই হোক আপনি চাইলেই কিন্তু ডায়রিয়া প্রতিরোধ করতে পারেন সহজেই। কিন্তু কি ভাবে করবেন?
১। প্রচুর ঘামের কারণে শিশুর বেশি পানির পিপাসা লাগে। তাই যত্র তত্র পানি পান না করিয়ে পরিষ্কার পানি পান করান।
২। গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়। তাইআপনার অজান্তেই পচা-বাসি খাবার খাওয়া হয় শিশুটকে। একটু শিশুকে খাবার খাওয়াতে সাবধান হন।
৩।যেসব রোগজীবাণুর কারণে ডায়রিয়া হয়, গরমে তার বংশবৃদ্ধিও অন্য সময়ের চেয়ে এ সময় বেড়ে যায়। তাই আপনার ঘরকে অবশ্যই জীবাণুমুক্ত রাখুন।

ডঃ এন কে নাতাশা।
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ হেল্‌থ সায়েন্স ।
সহকারী পরিচালক, দেস ফ্রিসকা।
০৪-০৫-২০১৫।

Share

আরও খবর