রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৬ আগস্ট, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
‘প্রভু মোচন কর ভয়
সব দৈন্য করহ লয়
নিত্যচকিত চঞ্চলচিত কর নিঃসংশয়
তিমির রাত্রি অন্ধ যাত্রী
সমুখে তব দীপ্ত দীপ তুলিয়া ধর হে-’

আমাদের চিত্ত যখন সংশয়ে পূর্ণ, চারপাশে যখন ঘোর অমানিশা, মানসিক দৈন্য যখন দৃশ্যমানভাবে প্রকট ইত্যাদি সংকটে রবীন্দ্রনাথেই আমরা আশ্রয় খুঁজে পাই। তিনি যেন সেই মহান মুক্তিদাতা পুরুষ যিনি দীপ্তশিখায় পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন। আজ সেই পরম পুরুষের মহাপ্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের (১৯৪১ সাল) এমন এক শ্রাবণ দিনে কবি কলকাতার পৈতৃক বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সে হিসাবে আজ তার ৭৫তম মৃত্যু দিবস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় নন্দিত। তিনি যথার্থই ‘বিশ্বকবি’। বিশেষণটি প্রথম ব্যবহার করেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়। কবি এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যার প্রভাব তৎকালীন ভারতে, বিশেষ করে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অনস্বীকার্য। সেই পরিবারে স্বশিক্ষায় বেড়ে ওঠেন তিনি। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় তার ‘অভিলাষ’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ১৮৭৮ সালের ৫ নভেম্বর কবির প্রথম বই ‘কবি কাহিনী’ প্রকাশিত হয় তার অগোচরে। সে সময় কবি পড়াশোনার জন্য বিলেত ছিলেন। বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষ বইটি প্রকাশ করে কবির কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই হল শুভসূচনা।

রবীন্দ্রনাথ অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীত স্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমুখী সৃজনশীলতা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের প্রায় সব কটি শাখা স্পর্শ করেছে, সমৃদ্ধ করেছে, যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। একপর্যায়ে তার রচনা বিশ্বসাহিত্যেও উচ্চারিত হয়। আর এভাবেই রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সম্মানের আসনে পৌঁছে দেন। তার হাত ধরেই আমরা অর্জন করি প্রথম নোবেলের সম্মান।

১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কবিকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কবি নাইট উপাধি ত্যাগ করে ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে চিঠি দেন। এখানে স্বদেশপ্রেমী, প্রতিবাদী এক রবীন্দ্রনাথকে আমরা পাই। কবির এ পরিচয় নতুন ছিল না। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে কবি কলম ধরলেন। লিখলেন প্রবন্ধ ‘লড়াইয়ের মূল’। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে বিভিন্ন রচনা লিখেছেন তিনি। ১৯১৬ সালে কবি জাপান সরকারের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে লিখলেন। সে বছর ঔপনিবেশিক নীতির প্রতিবাদে কানাডা ভ্রমণের আমন্ত্রণও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি ১৯৩৪ সালে পূর্ব বিহারে ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে মহাত্মা গান্ধী যখন ‘অস্পৃশ্যতার পাপের ফল’ বলে মন্তব্য করলেন, তখনও এই অভিমতের বিরুদ্ধে কবি দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক চেতনায় ছিল মানবমুক্তি। মানুষের কল্যাণের জন্য যে সাধনা তাই ছিল তার ধর্ম। তিনি বিশ্বাস করতেন বিশ্বমানবতায়। শুধু বাঙালির নয়, বিশ্বলোকের মুক্তির বার্তা তাকে আলোকিত করেছে। সেই আলোয় আজও আমরা উদ্ভাসিত। আনন্দে, বেদনায় এমনকি দ্রোহে তিনি তাই আমাদের প্রেরণার প্রধান উত্স। সৃজনশীল সাহিত্য রচনার পাশাপাশি অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তার ভাবনা তাকে তাড়িত করেছে আমৃত্যু।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলের আয়োজনে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে থাকছে নাটক, টক শো, কবিতা আবৃত্তি, সংগীতানুষ্ঠান, প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এই এত দিন পরেও সেখানে উচ্চারিত হবে প্রাসঙ্গিক কবিগুরুর পঙ্‌ক্তিমালা-

‘কামনা করি একান্তে
হউক বরষিত নিখিল বিশ্বে সুখ শান্তি।
পাপতাপ হিংসা শোক পাসরে সকল লোক,
সকল প্রাণী পায় কূল
সেই তব তাপিতশরণ অভয়চরণপ্রান্তে।’

Share

আরও খবর