২৪ সেপ্টেম্বর, অনলাইন ডেস্কঃ রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ সংস্থা দুদকে অভিযোগের পাহাড়। প্রতিদিন জমা পড়ছে একের পর এক অভিযোগ।

গত ২৭ জুলাই দুদকে চালু করা হয় তিন ডিজিটের টেলিফোন হটলাইন-১০৬ সেবা। ৫৬ দিনে ফোন কলের মাধ্যমে ১ লাখ ৯৭ হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে। মূলত লিখিত অভিযোগ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতিসংক্রান্ত সংবাদ আমলে নিয়ে চলে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান কার্যক্রম। অভিযোগ আমলে নিতেই যোগ হয়েছে দুদক হটলাইন-১০৬। এ হটলাইনে প্রতিদিন কয়েক হাজার কল আসে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু দুদকের তফসিলভুক্ত না হওয়ায় অনেক দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিতে পারছে না সংস্থাটি। তফসিলভুক্ত না হওয়ায় লিখিত কিংবা মৌখিক হটলাইনকেন্দ্রিক অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অভিযোগ আমলে নেয় না দুদক। ফলে ওই অভিযোগের বিষয়ে দুদকের করণীয় কিছু থাকে না। অর্থাৎ শুধু তফসিলের বিষয়ে জনসাধারণের স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় অধিকাংশ অভিযোগে দুদককে নীরব ভূমিকা পালন করতে হয়। এ কারণে দুদক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুদকের তফসিল বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন।

দুদক পরিচালক এ কে এম জায়েদ হোসেন বলেন, ‘হটলাইন সেবা চালু হওয়ার পর গতকাল পর্যন্ত ১ লাখ ৯৭ হাজার অভিযোগের ফোন কল এসেছে। এর মধ্যে আমলযোগ্য অভিযোগের সংখ্যা সাড়ে চার শর কিছু বেশি হবে। এর মধ্য থেকে হাতে গোনা ২০-২২টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অন্য অভিযোগগুলোর স্থান হয়েছে বন্ধ নথিতে। ’

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘এত দিন দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ আসত দুদকে। এখন হটলাইন-১০৬ সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সহজে অভিযোগ করার নতুন ক্ষেত্র পেয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতার কারণে আমরা কিছু একটা করার চেষ্টা করছি। মানুষ চাইলেই পয়সা ছাড়াই অভিযোগ করতে পারছেন। এ ছাড়া হটলাইন চালুর পর থেকে সাধারণ যে কোনো ব্যক্তি জন্মনিবন্ধন, জমি, কাবিখা ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বেশি অভিযোগ করতে পারছেন। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসছে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে। অভিযোগের ৯০ শতাংশই দুদকের তফসিলভুক্ত নয়। ’

দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘সবার আগে নজর দিতে হবে কোন কোন অভিযোগ দুদকের তফসিলভুক্ত। এরপর যিনি অভিযোগ করছেন তার পরিচয়, নাম-ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর যথার্থ কিনা। এসব যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ কিনা। তফসিলবহির্ভূত অপরাধ বিষয়ে ঢালাও অভিযোগ আসার কারণে দুদককেও মাঝেমধ্যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুদক আইন-২০০৪ ও দুদক বিধিমালা-২০০৭ অনুসারে কাজ শেষে আদালতে অভিযোগটি প্রমাণ করা যাবে কিনা। প্রমাণে কী পরিমাণ অর্থ, শ্রম, মেধা, সময় ও উপকরণ প্রয়োজন হয়। আসলে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগ কিন্তু তত বেশি হচ্ছে না। তবে অনেক ক্ষেত্রে তফসিলভুক্ত না হলেও আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলছি। দুদকে অভিযোগ করার আগে জানতে হবে কোন কোন অপরাধ দুদকের তফসিলভুক্ত। শত্রুতাবশত কিংবা অযথা হয়রানির উদ্দেশ্যে অভিযোগটি দিয়েছে কিনা এবং সবশেষে বিবেচিত যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তার দফতর, দাফতরিক মর্যাদা, বর্ণিত অপরাধ করার ক্ষমতা ও সুযোগ আছে কিনা। ’

দুদক সূত্র জানায়, দুদকে কোন ধরনের অভিযোগ নেওয়া হয়, আর কীভাবে অভিযোগ করতে হয় এসব জানা না থাকায় অনেকে ঠিকমতো অভিযোগ দিতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় তথ্যও দেন না অনেকে। তাই বাছাই পর্যায়ে বাতিল হয়ে যায় এসব অভিযোগ।

অভিযোগের ধরন ও যাচাই-বাছাই : দুদকের তফসিলভুক্ত ও তার শাস্তির বিধানসহ উল্লেখযোগ্য অপরাধগুলো হলো : সরকারি চাকরিজীবীদের দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ বা উপঢৌকন গ্রহণ। এ ধরনের অপরাধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬২ ও ১৬৩ ধারায় এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীসহ বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক যদি বেআইনিভাবে নিজ নামে কিংবা বেনামে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন, দুদক আইনের ১৬৫ ধারায় তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের আইন অমান্যের কারণে কোনো ব্যক্তির ক্ষতি হলে ও ইচ্ছাকৃত ভুল নথি উপস্থাপনে কারও ক্ষতি হলে আইনের ১৬৬ ও ১৬৭ ধারায় এক থেকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেন কিংবা অন্যায়ভাবে নিলামে কোনো সম্পত্তি কেনেন তাহলে দুদক আইনের ১৬৮ ও ১৬৯ ধারায় এক থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধার রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি কোনো অপরাধীকে শাস্তি থেকে রক্ষার চেষ্টা করেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য সংরক্ষণে কারও কোনো ক্ষতি হলে তা দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে আইনের ২১৭ ও ২১৮ ধারায় দুই থেকে তিন বছরের শাস্তি ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, সরকারি কর্মচারী এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী যদি সরকারি অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাৎ কিংবা ক্ষতিসাধন করেন অথবা মিথ্যা হিসাব দাখিল করেন; জালিয়াতির কোনো দলিল বৈধ ব্যবহার করেন এবং অপরাধীর কাছে গোপন তথ্য ফাঁস করেন তা দুদক আইনের ৪০৯, ৪৭৭, ৪২০, ৪৬২, ৪৬৬, ৪৬৯ ও ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

Share

আরও খবর