১৯ জুলাই, ডেস্ক রিপোর্টঃ স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইয়ে আগ্রহ কমে গেছে শিক্ষার্থীদের। তারা চাপিয়ে দেওয়া অবৈধ নোট ও গাইড বই মুখস্থ করতেই ব্যস্ত। এ নিয়ে উদাসীন কর্তৃপক্ষ। নেই কোনো পদক্ষেপ।

জানা গেছে, অবৈধ নোট ও গাইড বই সারা দেশে ছড়িয়ে বিভিন্ন পাবলিকেশন্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করছে। এর ভাগ পান সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরাও। ফলে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ হচ্ছে না। ধ্বংস হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শিক্ষার নোট ও গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চান শিক্ষাবিদরা।

দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন প্রধান গুরুত্ব পরীক্ষার ওপর। শিক্ষার ওপর নয়। স্কুলের সাফল্য নির্ভর করে পরীক্ষার ওপর। তার মতে, সৃজনশীল পদ্ধতি ছাত্র ও শিক্ষক কেউ বোঝে না। এজন্য নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এখন শিক্ষার্থীরা ভর্তির জন্যও নোট এবং গাইড বই কিনছে। কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে। বই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের আধিপত্য বাড়ছে। শিক্ষা এখন টাকায় কেনার চেষ্টা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার গুণগতমান বাড়ছে না। এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।

জানা গেছে, ১৯৮০ সালে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধকরণ আইনে এই ধরনের বই ছাপা ও বাজারজাত করা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এ জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্দেশনা দেয়। তা সত্ত্বেও নোট ও গাইড বইয়ের বিরুদ্ধে, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অবাধে সারা দেশে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে অবৈধ নোট ও গাইড বই। এমনকি শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইড বই অনুসরণ করতে একশ্রেণির শিক্ষক উৎসাহ দিচ্ছেন। এসব শিক্ষক ৫৫টি পাবলিকেশন্সের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘুষের বিনিময়ে তারা শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইড বই অনুশীলন করতে অনেককে বাধ্য করছেন বলে জানা গেছে। সরেজমিন রাজধানীর নীলক্ষেত, বাংলাবাজার, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন লাইব্রেরিতে প্রকাশ্যেই নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বই বিক্রি করতে দেখা যায়। এসব বই কিনতে প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও ভিড় করছেন দোকানে দোকানে। তাদের হাতে স্লিপ থাকে যা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয় বলে একাধিক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। আর এসব বইয়ের দামও থাকে অনেক বেশি।

জানা গেছে, ঢাকাসহ সারা দেশের হাজার হাজার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের একশ্রেণির শিক্ষক ও প্রকাশক এই অবৈধ বই বাণিজ্যে জড়িয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এমন বইয়ে বাধ্য করে শিক্ষার্থীদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যার দিকে। তাদের সৃজনশীলতা ধ্বংস করা হচ্ছে। মেধা খাটিয়ে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রশ্নের উত্তর ও অন্যান্য বিষয় জানার চেষ্টা করার মধ্যে শিক্ষার্থীকে যে চিন্তা ও মনযোগ দিতে হয়, তাতে তাদের মেধা বিকাশের পথ খুলে যায়। কিন্তু ভুলভ্রান্তিতে ভরা নোট ও গাইড বইয়ে সব কিছু থরে থরে সাজানো থাকায় শিক্ষার্থীদের মেধার প্রকৃত বিকাশ হয় না। আবার সরকার যে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু করেছে তাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে অবৈধ নোট ও গাইড বই। অনেক শিক্ষক অভিজ্ঞ না হওয়ায়, তারাও নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি— বাকবিশিসের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ এন রাশেদা বলেন, ‘সহায়ক গ্রন্থ’র নামে বাজারে এখন নোট ও গাইড বই বিক্রি হচ্ছে। এর কমিশন সবাই পায়। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষক পর্যন্ত, বিভিন্ন স্তরে স্তরে সবাই কমিশন খাচ্ছেন। আবার ভালো শিক্ষকেরও অভাব আছে। যোগ্য শিক্ষকের বদলে অযোগ্যরা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পায়। সংকট উত্তরণে শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার।

তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড—এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, অবৈধ নোট ও গাইড বই বন্ধের দায়িত্ব আমাদের নয়। এমনকি অনুমোদনহীন বই পড়ানোর বিষয়ে তদারকি ব্যবস্থা বা বন্ধের কার্যক্রম এনসিটিবিতে নেই। এক

জরিপেও দেখা গেছে, ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী নোট বা গাইডের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি একজন শিক্ষার্থী একই বিষয়ের তিন-চারটি গাইড বইও কিনে থাকে। মূলত ৮ থেকে ১০টি পাবলিকেশন্স নোট ও গাইডের জমজমাট ব্যবসা করছে। আর সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সারা দেশের বইয়ের দোকানগুলোতে অবৈধভাবে গ্যালাক্সি, লেকচার, অনুপম, জননী, জুপিটার, আদিল, দিগন্ত, ক্যামব্রিয়ান, গ্লোবাল, ক্লাস ফ্রেন্ড, অ্যাপোলো, সংসদ, ক্যাপ্টেন, সুপার, ছাত্রকণ্ঠ পাবলিকেশন্সসহ ৫৫টি প্রকাশনীর ছাপানো নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বই ফ্রি-স্টাইলে বিক্রি হচ্ছে। একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ম্যানেজ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভুলে ভরা নিম্নমানের এসব বই। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে দীর্ঘদিন ধরে নোট ও গাইড বই বিক্রির সিন্ডিকেটের এই বই বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই প্রশাসনের। এদিকে শিক্ষকদের ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে বই বাণিজ্য সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দুই বছর আগে পাঠানো হলেও নোট ও গাইড ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ আকারে পাঠানো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল— ৫৫টি প্রকাশনী শিক্ষকদের একটি অংশকে ঘুষ দিয়ে নোট ও গাইড বই ‘পুশ সেল’ করেছে। এ নিয়ে এনসিটিবির সাঁড়াশি অভিযান চালানোর দায়িত্ব হলেও তা তারা করছে না। অথচ শিক্ষা আইনে সহায়ক বই প্রকাশে এনসিটিবিকে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। অপরদিকে পাঠ্য বইয়ে পাতায় পাতায় থাকা ভুলের সুযোগ নিয়ে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে নোট ও গাইড বই প্রকাশনীগুলো।

জানা গেছে, প্রকাশনা সংস্থাগুলো পাঠ্য বইয়ে যেসব ভুল আছে সেগুলো সংশোধন করেই তাদের গাইডে ছাপছে। এমনকি নির্ভুল গাইড বা সহায়ক বইয়ের প্রচারেও নানা রকম কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। রাজধানীর ধানমন্ডি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র রাফিত আনোয়ারের বাবা আবদুল আলিম গতকাল বলেন, তার ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। পাঠ্য বইয়ে ভুল থাকার কারণে তাকেও নোট ও গাইড বই কিনতে হয়েছে। তিনি বলেন, পাঠ্য বইয়ে বাংলা বিষয়ে অনেক ভুল থাকায় গাইড কিনেছি। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলের কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, একদিকে কোচিং সেন্টার বন্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। অন্যদিকে পাঠ্য বইয়ে প্রচুর ভুলভ্রান্তি। ফলে সরকারই কোচিং সেন্টারে পড়ালেখা করাতে উৎসাহিত করছে। আবার সহায়ক বই প্রকাশেও বাধা নেই। ফলে সরকার মুখে মুখে নোট ও গাইড বন্ধের কথা বললেও বাস্তবতা তা বলে না। কারণ— স্কুলে তেমন কোনো লেখাপড়া হয় না। শিক্ষকরাও অনেক কিছু বোঝেন না। তারাও নোট ও গাইডের দ্বারস্থ হন। বর্তমান পাঠ্য বইয়ের ভুলভ্রান্তিতে শিক্ষার্থীরা নোট ও গাইডের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হবে। জানা গেছে, অনেক স্কুলের পড়ালেখাই এখন শিট বা ফটোকপি নির্ভর হয়ে গেছে। পাঠ্য বইয়ের বদলে সেখানে শিট দেওয়া হয়। যতটুকু পড়ানো হবে, ততটুকুর শিট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া গ্রামের অনেক স্কুলেই মূল পাঠ্য বইয়ের বদলে সরাসরি নোট ও গাইড পড়ানো হয়। এমনকি শিক্ষার্থীরা গাইড নিয়েই স্কুলে আসে।

Share

আরও খবর