২৪ ডিসেম্বর, ডেস্ক রিপোর্টঃ মজুরি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে আশুলিয়ায় গার্মেন্ট খাতের অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এলাকার ৫৯টি কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।

মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আন্দোলন শুরুর প্রথম কয়েক দিন শ্রমিকরা বিক্ষোভ করলেও কারখানা বন্ধের পর পরিস্থিতি শান্ত আছে। তবে শ্রমিকরা আন্দোলন না করলেও আশুলিয়ায় এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। শ্রমিকদের মধ্যে এখন গ্রেফতার আতঙ্ক। আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে শুরু হয়েছে শ্রমিক ছাঁটাই। আটক করা হয়েছে শ্রমিক নেতাসহ কয়েকজন শ্রমিককে।
শিল্প পুলিশ সূত্র জানায়, বিজিএমইএর ঘোষণার পর এ পর্যন্ত মোট ৮৪টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়েছে। এতে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ৭০-৮০ কোটি টাকা। বিশাল পরিমাণ ক্ষতি সত্ত্বেও শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিজিএমইএর নেতারা। এ অবস্থায় কাজ না থাকায় লাখ লাখ শ্রমিকের অনেকেই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরেই দিন কাটাচ্ছেন। আবার অনেকে নতুন কারখানায় কাজ খুঁজছেন।

জানা যায়, এরই মধ্যে আন্দোলনের কারণে ২৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে বিশেষ আইনে ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দুটি কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই ও মামলা করেছে। ফাউনটেইন গার্মেন্টের প্রধান ফটকে টাঙানো হয়েছে ১৩৫ জন শ্রমিকের ছাঁটাই নোটিস। এ ছাড়া উইন্ডি অ্যাপারেলস ১২১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। এ ছাড়া ছয় শতাধিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা হয়েছে। আর শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে শ্রমিক সংগঠনের পাঁচ নেতাকে আটক করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে সকাল থেকেই সড়কের দুই পাশের কারখানার প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকাগুলোয় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল এলাকার ৮৪টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। তবে যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কারখানার সামনে অতিরিক্ত বিজিবি ও পুলিশ এবং র‌্যাব মোতায়েন রাখা হয়েছে। এদিকে কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের দৈনিক বেতন যেমন কাটা হচ্ছে তেমনি পোশাক উৎপাদন না হওয়ায় পোশাক খাত বিপুল পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারখানা বন্ধ থাকায় এবং বেতনের টাকা কাটায় তারা চিন্তিত। আর মাসের মাঝামাঝিতে কারখানা বন্ধ করায় শ্রমিকদের অনেকেই সামনের মাসের বাড়ি ভাড়া ও বাজার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। শ্রমিকরা জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বছর বছর বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্যই তারা মজুরি বৃদ্ধির দাবি করেছেন।

বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান  বলেন, বর্তমানে আমাদের ৫৯টি কারখানা বন্ধ আছে। আর কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় দৈনিক ৭০-৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। আন্দোলন শুরুর পর শ্রমিকরা এক ঘণ্টা করে কাজ করে কর্মবিরতিতে যেত। কিন্তু এরপর তারা কার্ড পাঞ্চ করেই বেরিয়ে যেত। এ জন্য কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হই। শ্রমিকরা ভুল বুঝে যদি কাজে ফিরে আসে এবং সরকার কারখানার নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস দেয় তবেই কারখানা খুলব। তা না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।

তিনি জানান, আপাতত শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই। ২০১৩ সালে সর্বশেষ বেতন বৃদ্ধি হয়। এর পাঁচ বছর পর যদি সরকারের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় তখন বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে ভাবা হবে। বিজিএমইএর একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আশুলিয়ার মাত্র ৫৯টি কারখানা শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে বিষয়টি এত সহজ নয়। শ্রমিকরা কাজে না ফিরলে তাদের পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে সব কারখানা খুলে দেওয়া, গ্রেফতার ও মামলা প্রত্যাহার, শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া মজুরি বোর্ড গঠন করে মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করার জন্য শ্রমিক নেতারা দাবি জানিয়েছেন।

শ্রমিক নেতারা বলেন, বছরের শুরুতেই শ্রমিকদের ঘর ভাড়া বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধিতে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে। সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, শ্রমিকরা অভাবের তাড়না থেকে আন্দোলন করছে। এর পেছনে কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ নেই। এ আন্দোলনকে পুঁজি করে মালিকরা একদিকে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নেবেন অন্যদিকে ক্রেতাদের কাছ থেকেও পণ্যের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নেবেন। তার মতে, চলমান পরিস্থিতিতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষকে আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান করতে হবে।

Share

আরও খবর